দুই পৃথক সত্তাকে এক গ্রন্থিতে গ্রন্থিবদ্ধ করার অদ্ভূত ক্ষমতার নামই মোহাম্মদ ফরহাদ
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 25 Sep, 2025
এম. এম. আকাশ
একজন বিপ্লবীর উত্থান
মোহাম্মদ ফরহাদকে নিয়ে কিছু লেখার অর্থ হচ্ছে প্রাক্তন পূর্ব-পাকিস্তান ও
বর্তমান বাংলাদেশের বাম আন্দোলনের প্রতি আরেকবার এক মনোযোগী দৃষ্টিপাত।
কমরেড ফরহাদ এর জন্ম হয়েছিল ১৯৩৮ সালে অর্থাৎ আমার ভূপৃষ্টে আসার প্রায় ১৬
বছর আগের ঘটনা। সুতরাং আমার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার কোনো সুযোগ ছিল
না। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই লেখাটি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ না হয়ে বরং
প্রধানত: হবে এক ধরনের রাজনৈতিক স্মৃতিচারণ।
তাঁকে আমি দেখেছি একজন অত্যন্ত সম্মানীত অগ্রজ পার্টি নেতা হিসেবে। পার্টির এক প্রান্তে ছিলেন ত্রিশ ও চল্লিশ দশকের সর্বত্যাগী বৃদ্ধ কমিউনিস্ট দাদারা– জ্ঞান চক্রবর্তী, অনিল মুখার্জী, জিতেন ঘোষ, মণি সিংহ, হেনা দি, অনিমা দি প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। আরেক প্রান্তে ছিলাম আমরা এক ঝাঁক তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী যারা মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম এবং সমাজতন্ত্রের প্রতি বিপুলভাবে আকৃষ্ট। আর মাঝখানে ছিলেন ৬০ দশকের বিশ্ববিপ্লবী আন্দোলনের তরঙ্গশীর্ষের তরুণ-তরুণীবৃন্দ–: মোহাম্মদ ফরহাদ, বজলুর রহমান, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন, মঞ্জুরুল আহসান খান, মতিউর রহমান, মালেকা বেগম, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। এঁরা ছিলেন ষাট দশকের “ঝঃড়হসরহম ঐবধাবহং” বা স্বর্গের ঝটিকাবাহিনী।
আর এই ষাট দশকের বিপ্লবী নক্ষত্রপুঞ্জের মধ্যে (যাঁদের সবার নাম আমি এখানে বলতে পারিনি বলে যারপরনাই ক্ষমাপ্রার্থী)। সবচেয়ে জ্বলজ্বলে নক্ষত্রটি ছিল নিঃসন্দেহে মো: ফরহাদ। জ্বলজ্বলে এই অর্থে নয় যে তিনি ছিলেন এদের মধ্যে একজন “কেরেসমেটিক”– না, তা তিনি ছিলেন না, কিন্তু তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি দখল করেছিলেন তা আর কারো পক্ষে দখল করা সম্ভব হয়নি। তিনি ছিলেন আমাদের সর্বত্যাগী প্রবীণ কমিউনিস্ট প্রজন্ম এবং পরবর্তী নবীন প্রজন্মের কমিউনিস্টদের মাঝে অন্যতম এক “সেতুবন্ধন”।
তিনি এমন একটি সংযোগসেতুর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছিলেন যা একইসঙ্গে সমান দৃঢ়তায় নবীন ও প্রবীণ প্রজন্মকে আঁকড়ে ধরতে সক্ষম হয়েছিল। এই দুই পৃথক সত্তাকে এক গ্রন্থিতে গ্রন্থিবদ্ধ করার অদ্ভূত ক্ষমতার নামই মোহাম্মদ ফরহাদ। জীবনের প্রতি প্রীতি, আধুনিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সৃজনশীলতা, টগবগে তারুণ্য, প্রতিভা ও পরিশ্রম ইত্যাদি গুণে সমৃদ্ধ নবপ্রজন্মকে পার্টিতে টেনে আনার জন্য যে ধরনের একটি পরশ পাথরের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন দাদারা, সম্ভবত: মো: ফরহাদের মাঝেই তাঁরা তা খুঁজে পেয়েছিলেন।
আমি মনে করি আমাদের দেশের বাম আন্দোলনে এটাই মোহাম্মদ ফরহাদের অনন্য কৃতিত্ব। এমন একটি “আলকেমী” যা নবীন ও প্রবীণ প্রজন্মের মহৎ ও ভালো গুণগুলোকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিল। পাকিস্তান ছিল একটি অগণতান্ত্রিক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। ভারতে গান্ধিজী ও জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে কমিউনিস্টরা যেটুকু সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে সক্ষম হয়েছিলেন– পাকিস্তানে তার আদৌ কোন সুযোগ ছিল না।
পাকিস্তানের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কমিউনিস্টদের অধিকাংশ সময় থাকতে হয়েছে “আন্ডার গ্রাউন্ডে”। কমিউনিস্ট মানেই তখন ছিল জেল-জুলুম-নির্যাতন। কমিউনিস্ট রাজনীতিতে যাঁরাই তখন দীক্ষা নিয়েছেন তাদের ধরে নিতে হয়েছে যে জীবনটা সুখের এবং নিরাপদ হবে না। কমরেড ফরহাদও খুব অল্প বয়সেই মনস্থির করেছিলেন যে “কঠিনকেই” তিনি ভালবাসবেন।
১৯৫২ সালে তার বয়স যখন মাত্র ১৬ বছর এবং তিনি যখন মাত্র নবম শ্রেণির ছাত্র তখনই তার রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞার সূচনা। এই বিষয়ে তার নিজের স্মৃতিচারণ: “লেনিনের বই পড়েছিলাম ‘কি করিতে হইবে’, নবম শ্রেণির ছাত্র অবস্থায়। ... মোদ্দা কথায় অবশ্য একটা কথা বুঝেছিলাম যে ধনী আর দরিদ্র, শোষক আর শোষিত– এই হল মূল দ্বন্দ্ব। আর শোষণমুক্ত সমাজের নাম হলো ‘সমাজতন্ত্র’। সমাজতান্ত্রিক মানুষের জীবনের সুখ আর আনন্দের ছবি দেখেছিলাম অনেক বইয়ে, পত্র-পত্রিকায়। বিলাত আমেরিকার মানুষের জীবনের ছবিও দেখেছিলাম। সেগুলোও সুন্দর। কিন্তু মন বলতো, সে সব দেশে শান্তি নাই, মানুষের ওপর শোষণ আছে সে সব দেশে। কাজেই অল্প বয়সে ভক্ত হয়ে গেলাম সমাজতন্ত্রের।
আমার স্কুলের খাতায় আঁকতাম কাস্তে-হাতুড়ির ছবি”। [মোহাম্মদ ফরহাদ, ‘স্মৃতি থেকে’ মোহাম্মদ ফরহাদ নিবেদিত রচনাগুচ্ছ, ১৯৮৮, পৃ: ১১৩]। “কাস্তে- হাতুড়ির” পক্ষে এই সিদ্ধান্ত নেহাত সখের সিদ্ধান্ত ছিল না। তিনি অল্প বয়সেই বুঝেছিলেন যে তিনি যে রাজনীতির পথ বেছে নিয়েছেন সেখানে “জেল-জুলম” অনিবার্য।
স্মৃতিচারণে মো: ফরহাদ বাবাকে যা বলেছিলেন তা এখানে তুলে ধরছি- “আমি যখন ঘোরতর রাজনীতি শুরু করি ১৫ বছর বয়সে, আমাকে মিছিলে– পথে দেখে রাতে বাসায় এসে বাবা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, – তুই কি লেখাপড়া করবি, না রাজনীতি করবি? আমি বলেছিলাম- লেখাপড়া করব, কিন্তু দেশের কাজও করব, জেলে যাবো।” [স্ত্রীকে লেখা পত্র, ২৫-১২-৭৬] জেলে যাওয়ার আগেই জেলে যাওয়ার রিহার্সাল শুরু করেছিলেন মোহাম্মদ ফরহাদ। “মোহাম্মদ ফরহাদ : জীবন ও সংগ্রাম” গ্রন্থে গবেষক নিতাই দাস লিখেছেন– “মো: ফরহাদ শুনেছিলেন যে জেলে গেলে খালি মেঝেতে ঘুমাতে হয় এবং বিছানা-মশারি কিছুই দেয়া হয় না। ঐ কষ্টের জীবনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য তিনিও তক্তপোষ থেকে বিছানা-মশারি গুটিয়ে নেন।
এভাবে খালি তক্তপোষে মশার দংশন সহ্য করে তাঁর অনেক রজনী অতিবাহিত হয়েছিল। একদিন অবশ্য তিনি এই অবস্থায় বাবার কাছে ধরা পড়ে যান।” এই তথ্যটি অবশ্য মো: ফরহাদ কমরেড নিতাই দাসকে জানান নি। এটা কিভাবে তিনি জেনেছিলেন তার বর্ণনা দিতে গিয়ে গ্রন্থভুক্ত পাঁচ নম্বর টীকায় (পৃ: ৫৬) লেখক লিখেছেন, “এই সময় তাদের এক আত্মীয় আজিমউদ্দিন মোহাম্মদ ফরহাদের সাথে একই ঘরে থাকতেন। ফরহাদ তাকে এই ঘটনা কারো কাছে প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ জানান। কিন্তু সাদাকাতুল বারী একদিন গুটানো বিছানা দেখে আজিমউদ্দিনকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে সব জেনে নেন।” [সাক্ষাৎকার, আজিমউদ্দিন, বোদা, জেলা: পঞ্চগড়] ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও মোহাম্মদ ফরহাদ এরকম একটা কথা প্রচলিত আছে যে কমিউনিস্টরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের পদে অধিষ্ঠিত হতে ব্যর্থ হয়েছিলেন কারণ তারা জাতীয় দাবী স্বাধীনতাকে যথাযথভাবে গুরুত্ব দিতে পারেন নি।
তারা এক পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে অধিকতর গুরুত্ব দিতে গিয়ে স্বায়ত্বশাসন এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন পূর্ববাংলা গঠনের দাবিকেও “স্পিয়ার হেড” করা বা সেই আন্দোলনের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বের হয়ে আসতে ব্যর্থ হয়েছেন। এমনকি কখনো কখনো “জয় বাংলার” বিপরীতে তারা জয় সর্বহারা শ্লোগান দিয়ে মারাত্নক রাজনৈতিক ভুলও করেছেন। অন্যদিকে চীন বা ভিয়েতনামের কমিউনিস্টরা জাতীয় স্বাধীনতার আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়ে তাকে সফল করে প্রগতিশীল পথে অগ্রসর করে নিতে সক্ষম হয়েছিল। তাই সেসব দেশে স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম সাবলীলভাবে পরস্পর গ্রথিত হয়ে এগিয়ে গেছে।
আমাদের মত রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পর তা সংহত হওয়ার আগেই পশ্চাৎপসারণের বিপত্তি সে সব দেশে ঘটেনি। তবে উপরোক্ত বর্ণনাটি সর্বাংশে সঠিক নয়। কমিউনিস্টদের মধ্যে চীনপন্থি ধারাটির ক্ষেত্রে এই বক্তব্য ঐতিহাসিকভাবে অনেকখানি সত্য হলেও মস্কোপন্থি হিসেবে পরিচিত কমিউনিস্টদের ক্ষেত্রে এই অভিযোগটি ঠিক সেইভাবে সঠিক নয়। চীনপন্থি কমিউনিস্টদের সেই সময়কার অবস্থান বর্ণনা করতে গিয়ে কমরেড হায়দার আকবর খান রনো যথার্থই লিখেছেন, “এই দলগুলো সকলেই আওয়ামী লীগের বিরোধী ছিল।
বাম কমিউনিস্টদের মধ্যে শেখ মুজিব সম্পর্কে ধারণা ছিল, তিনি আমেরিকার সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সম্পর্কিত। তখন আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের সঙ্গে ভাসানী সমর্থক ন্যাপ বা বিভিন্ন কমিউনিস্ট গ্রুপের ছোট-খাট সংঘর্ষ হয়েছিল। দুপক্ষের মধ্যে স্লোগানের প্রতিযোগিতাও ছিল। আওয়ামী লীগ বলতো ‘জয় বাংলা’। কমিউনিস্টরা বলতো ‘জয় সর্বহারা’।” [হায়দার আকবর খান রনো, শতাব্দী পেরিয়ে, ২০০৫, পৃ:-২১৪] পক্ষান্তরে মো: ফরহাদের বক্তব্য ও পার্টির দলিলপত্র থেকে প্রতীয়মান হয় যে এই বিশেষ ক্ষেত্রে মস্কোপন্থি কমিউনিস্টদের বিবেচনা ছিল অপেক্ষাকৃত প্রাগসর (গধঃঁৎব)।
১৯৬৮ সালে অনুষ্ঠিত “মস্কোপন্থি” কমিউনিস্টদের প্রথম কংগ্রেসে গৃহীত এক প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, “পাকিস্তান রাষ্ট্রের গঠন বৈশিষ্ট্য এখানকার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারা ও প্রকৃতি, পাকিস্তানকে বিভিন্ন অঞ্চলের ভিতর অসম সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকাশ, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, এখানকার জাতিসমূহের লেনিনবাদী আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতির স্বীকৃতি প্রভৃতি বাস্তব বিষয় বিচার করিয়া পূর্ব বাংলায় স্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার বিশেষ দায়িত্ব পালন করিতে হইবে।” (পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মসূচী, ১৯৬৮, পৃ: ৩৩) অতএব দেখা যাচ্ছে “স্বাধীনতার” ব্যাপারটি যে ঘটবে তা “মস্কোপন্থি” পার্টির নেতৃবৃন্দ ১৯৬৮ সালে সঠিকভাবেই অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তবে নীতিগত অনুধাবন এবং বাস্তব অনুশীলনীর মাধ্যমে জনগণের সামনে তা প্রস্ফূটিত করে তোলা এক জিনিস নয়। নেতৃত্বের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় মেলে চিন্তাকে কার্যে পরিণত করার মুহূর্তটিতে এবং সেখানেই তার পারঙ্গমতার পরীক্ষা! সে ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই কোন সীমাবদ্ধতা ছিল না হলে কেন জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আরো আগে ৬ দফা তা স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রামের নেতৃত্ব কেন কমিউনিস্টদের হাত গলিয়ে জাতীয়তাবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের হাতে চলে গেল। এই প্রসঙ্গে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্বাক্ষী এখানে তুলে ধরা প্রাসঙ্গিক হবে।
ছাত্র ইউনিয়নের বিশিষ্ট প্রাক্তন নেতা সামসুদ্দোহা তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্র ইউনিয়নের একুশের অনুষ্ঠানে আমি বক্তৃতা দেয়ার জন্য আহুত হই। সে সভার সভাপতি ছিলেন আবুল হাসনাত। তখন আমরা পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষি জনগণের আত্ননিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলতাম। এই সভায়ও এমন একটা বলব এটাই ঠিক ছিল। সভা চলাকালীন হঠাৎ আমি ফরহাদ ভাইয়ের চিঠি পাই। তাতে মার্চে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন না বসলে পূর্ববাংলা স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হতে বাধ্য হবে– এই পয়েন্টসের উপরই মূল গুরুত্ব দিয়ে বক্তৃতা করতে ফরহাদ ভাই পরামর্শ দেন। --আমি ছাত্র ইউনিয়নের সেই সভায় স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করেছিলামÍ-।” [“স্মৃতিচারণ, সামসুদ্দোহা, ২০-৪-৮৯]
নিজের নাম উল্লেখ না করে পরবর্তীতে মো: ফরহাদ এই বিষয়ে বলেন, “৭০ এর সাধারণ নির্বাচনের পর ইয়াহিয়া-ভুট্টোর চক্রান্তের প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটন করে ‘৭১ এর ২২ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্র ইউনিয়নের তদানিন্তন নেতা সামসুদ্দোহা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, ‘ইয়াহিয়া-ভুট্টোর চক্রান্তের জবাব হবে স্বাধীন বাংলা কায়েম করা। আমার জানা মতে কোনো সংগঠনের পক্ষ থেকে ‘স্বাধীন বাংলা’ কায়েমের বিষয়ে এরকম প্রকাশ্য ঘোষণা হিসেবে এটাই ছিল প্রথম ঘোষণা।” [মো: ফরহাদ, “দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ যে সংগঠন”, গৌরবের সমাচার, পৃ:-১৪]
যাই হোক, এ বিষয়ে এত বিস্তৃত ও উদ্ধৃতিবহুল বর্ণনাটি দেয়ার উদ্দেশ্য এটা প্রমাণ করা নয় যে “কমিউনিস্টরা” জাতীয়তাবাদীদের চেয়ে আগেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের কৃত্রিমতা অনুধাবন করে স্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ কায়েম করতে চেয়েছিলেন, বরং এটাই দেখানো যে সঠিক অনুধাবনের পরেও সেই সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদান করা কমিউনিস্টদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এই একই কথা আরো বেশি প্রবলভাবে সত্য ছিল “চীনপন্থি” কমিউনিস্টদের ক্ষেত্রে। চীন ভূ-রাজনৈতিক কারণে এবং সোভিয়েত বিরোধীতার কারণে সে সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। ফলে “চীন” ভক্ত কমিউনিস্টদের জন্য অবস্থাটা ছিল আরো কঠিন– শাখের করাতের দশা।
চীনপন্থি কমিউনিস্টরা দাবি করেন যে ১৯৬৭ সালে ই.পি. সি.পি (এম এল)–এর প্রথম কংগ্রেসেই তারা স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলার রণনীতি গ্রহণ করেন। কেন আগে ঘোষণা দেওয়ার পরেও তারা শেষ পর্যন্ত জাতীয় কর্তব্যের সংগ্রামে নেতৃত্ব দানে ব্যর্থ হলেন এই প্রশ্নটি তাদের তদানিন্তন অন্যতম নেতা কমরেড হায়দার আকবর খান রনো নিজের কাছেই নিজে করে যে উত্তর প্রদান করেছিলেন সেটা প্রাসঙ্গিক বিধায় এখানে তুলে ধরছি– “আমরা যদি ১৯৭১ বা ১৯৬৯ থেকেও আরো পেছনের দিকে ফিরে যাই তাহলে দেখব, মাওলানা ভাসানীসহ কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক শক্তিই প্রথম এবং সবচেয়ে জোরের সঙ্গে তুলে ধরেন তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর জাতিগত নিপীড়নের কথা। কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে এই নিপীড়ন বিরোধী সংগ্রামের নেতৃত্ব তাঁরা ধরতে পারলেন না। কেন? সংক্ষেপে হলেও এই কেনর উত্তর দেয়া দরকার।
আমার মতে, কয়েকটি কারণকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। কমিউনিস্ট শক্তির বহুধা বিভক্তি। নির্দিষ্ট সময়ে গোটা জাতির প্রশ্নকে হাল্কা করে দেখে অভ্যন্তরীণ শ্রেণিসংগ্রামকে প্রাধান্যে নিয়ে আসা। কমিউনিস্টদের একাংশের মধ্যে এই প্রবণতা ছিল। কমিউনিস্টদের একাংশের মধ্যে নকশাল রাজনীতির মারাত্নক ক্ষতিকর ও আত্মঘাতী প্রভাব। কমিউনিস্টদের একাংশ (যাঁরা রুশপন্থি বলে পরিচিত ছিলেন) আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে চলার প্রবণতা এবং স্বাধীনভাবে দাঁড়াবার ব্যাপারে আস্থার অভাব। চীনপন্থি বলে পরিচিত খণ্ড-বিখণ্ড কমিউনিস্ট দল ও গ্রুপগুলোর একাংশ দেশের অভ্যন্তরে অনেক বীরত্বপূর্ণ সশস্ত্র সংগ্রাম করলেও একাংশ ১৯৭১ সালে প্রধানতঃ চীনের ভূমিকার কারণে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে তখনকার অবস্থায় প্রধান বা একমাত্র করণীয় হিসাবে দেখেননি। “দুই কুকুরের কামড়া-কামড়ির” ভ্রান্ত তত্ত্বের কথা অনেকেরই জানা আছে।
কিন্তু এখানে উল্লেখ্য যে, চীনপন্থী বলে পরিচিত দল বা গ্রুপগুলোর বিরাট অংশ সরাসরি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সাহসী যুদ্ধ করেছে, যা তেমন প্রচারে আসে না।” [হায়দার আকবর খান রনো, “স্বাধীনতা উত্তর তিন দশকের কমিউনিস্ট আন্দোলন একটি পর্যবেক্ষণ”, রাজনীতির কথা প্রসঙ্গে, তরফদার প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি, ২০০৩, পৃ: ১০৮] সুতরাং দেখা যাচ্ছে চীনপন্থিরা জাতীয় দাবির সারবত্তা বুঝতে পারেন নি। আর মস্কোপন্থিরা বুঝতে পারলেও সঠিক সময়ে সঠিক স্লোগানটি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে পারেনি। এ কথা ঠিক যে কমিউনিস্টদের সবসময় বর্তমানের মধ্যে ভবিষ্যতের প্রতিনিধিত্ব করতে হয় বা হবে, কিন্তু বর্তমানে নিছক ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর হলে চলে না বরং বর্তমানের প্রতিই সর্বাধিক মনোযোগ দিয়ে সেখানেই ভবিষ্যতের বীজমন্ত্রকে আবিষ্কার ও তার সর্বোচ্চ পরিচর্যা সাধন করতে হয়। জনগণের নেতৃত্ব দেয়ার অর্থ জনগণের আগে থাকা শুধু নয়, এর একটি আবশ্যকীয় শর্ত হচ্ছে “জনগণের সঙ্গে থাকা” সঠিক নীতি, কৌশল বা স্লোগান, কখনোই কোন প্রতিভাবান নেতার একক মস্তিষ্কপ্রসূত বিষয় নয়– তা সবসময়ই তৈরি হয় ঐতিহাসিক মুহূর্তে অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিধ্বনি হিসেবে। এই “সম্মিলিত ইচ্ছার” বিষয়টি অনুপস্থিত থাকলে নেতা প্রদত্ত স্লোগানটি সঠিক হলেও, তা হবে নিছক একটি বিমূর্ত যুক্তির বিষয়– জীবনের বিষয় নয়।
নেতার দূরদৃষ্টি হচ্ছে সেইখানে যে তিনি সঠিক ভবিষ্যতকে অগ্রীম অনুধাবনে সক্ষম হয়েছেন এবং কিভাবে সেই বিন্দুতে পৌছাতে হবে তাও তিনি জানেন। ‘লক্ষ্য’ জানাটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ-কৌশলটি জানা। বিভিন্ন আগু-পিছু পদক্ষেপের দ্বান্দ্বিক পর্যায়ক্রমটি জানা।
সম্ভবত: আমাদের উভয় ক্যাম্পের বামপন্থি নেতাদের ক্ষেত্রেই এই ঘাটতিটি ছিল। তবে আমি বলার চেষ্টা করবো এ ক্ষেত্রে মোহাম্মদ ফরহাদ অনেক দিক থেকেই অনেকের চেয়ে বেশি কৌশলী ও উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছিলেন। বিশেষ করে ৮০-এর দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে পার্টিকে শত বাধা-বিপত্তির মধ্য দিয়ে, লক্ষ্যে অবিচল থেকে, এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ও শক্তিশালী পার্টি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তার অতুলনীয় অবদান থেকে আমাদের অনেকেরই অনেক কিছু শেখার রয়েছে বলে ধারণা করি। নিঃসন্দেহে মো: ফরহাদ দেবতা ছিলেন না। তারও ভুল ক্রটি ছিল। কিন্তু একজন সুদূরপ্রসারী এবং তাৎক্ষণিক মূর্ত প্রয়োজন সম্পর্কে একই সঙ্গে সমান মনোযোগী “স্ট্র্যাটেজিস্ট” (রণকৌশলবিদ) হিসেবে তার দক্ষতা তিনি প্রমাণ করেছেন স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতিতে।
তাঁর অকাল মৃত্যুতে পার্টির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। উপসংহারের পরিবর্তে আমি এই ছোট্ট প্রবন্ধে তিনটি সাধারণ স্তর বা মুহূর্তকে চিহ্নিত করার প্রয়াস পেয়েছি। প্রথম স্তরে নিশ্চয়ই লক্ষ্য করা যাবে মোহাম্মদ ফরহাদের বিপ্লবী আদর্শে দীক্ষা ও বিপ্লবী হিসাবে উত্থানের মুহূর্তটি। দ্বিতীয় স্তর বা দ্বিতীয় মুহূর্তটি হচ্ছে বিপ্লবী গুণাবলির চর্চা, তার প্রয়োগ ও নতুন গুণাবলি অর্জনের মাধ্যমে যুবক ফরহাদের বিপ্লবী পার্টির নেতায় পরিণত হওয়ার বিষয়টি। আর সর্বশেষ তৃতীয় স্তরে পরিণত কমরেড ফরহাদ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন “জাতীয় নেতা” হিসাবে।
সেখানে তার অর্জন শুধু পার্টির নেতা হিসাবে নয়, জাতীয় নেতা হিসেবে আরো উঁচুতে প্রতিষ্ঠিত এক অর্জন। এই তিন মুহূর্ত তথা, “বিপ্লব দীক্ষা”, “বিপ্লব চর্চা”, এবং “জাতীয় নেতা হওয়া” থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দিনের মোহাম্মদ ফরহাদরা একবিংশ শতাব্দিতে বাংলাদেশের দুঃখ ঘুচাবেন–এটাই প্রত্যাশা।(লেখাটি সাপ্তাহিক একতায় ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রকাশিত হয়)
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

